ঢাকা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পশ্চিমের এক জেলা — নীলফামারী। একসময় এখানে ইংরেজ নীলকরদের পদচারণায় মুখর ছিল মাঠ-ঘাট। সেই নীল চাষের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠি, চিনি মসজিদ আর ধর্মপালের গড়। প্রকৃতিপ্রেমী থেকে ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু — সবার জন্যই নীলফামারীতে রয়েছে দেখার মতো অনেক কিছু।
নীলসাগর এই জেলার সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় স্থান। ৯৩.৯০ একর আয়তনের এই বিশাল দীঘির গভীরতা আজও মাপা সম্ভব হয়নি। জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই স্থানে শীতকালে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে। ১৯৮০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল জব্বার দীঘিটির আধুনিকায়ন করে নাম রাখেন 'নীলসাগর'।
স্থাপত্যের দিক থেকে চিনি মসজিদ এক বিস্ময়। জেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে সৈয়দপুরে অবস্থিত এই মসজিদে চীনামাটির রঙিন পাথরের টুকরো দিয়ে চিনির দানার মতো নিখুঁত কারুকাজ করা হয়েছে। ১৮৮৩ সালে নির্মিত মুঘল স্থাপত্যের এই দ্বিতল মসজিদে রয়েছে ২৭টি মিনার, ৩টি বড় গম্বুজ এবং ২৪৩টি মর্মর পাথর।
কৃষি ও পর্যটন — দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা ব্যারেজ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম সেচ প্রকল্প হিসেবে তিস্তা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা দর্শনার্থীদের কাছে একটি আলাদা আকর্ষণ।
ব্রিটিশ আমলের স্মৃতিচিহ্ন নীলকুঠি এখন নীলফামারী অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর ঔপনিবেশিক স্থাপত্য আজও দর্শনার্থীদের টানে। জেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন রেল স্টেশনের কাছেই এর অবস্থান।
প্রত্নতত্ত্বের আগ্রহীদের জন্য রয়েছে ধর্মপালের গড় — জলঢাকা উপজেলার দেওনাই নদীর পূর্বতীরে প্রাচীন পাল রাজবংশের এই নিদর্শন এখনও ইতিহাসের নিরব সাক্ষী। একই উপজেলার খুটামারা ইউনিয়নে রয়েছে হরিশচন্দ্রের পাঠ — একটি প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। পাশাপাশি রহস্যময় ভীমের মায়ের চুলা স্থানীয় পৌরাণিক কাহিনী ও প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের সমন্বয়ে এক অনন্য পর্যটনস্থল।
শিল্প ও ইতিহাসের সংমিশ্রণে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে। একই শহরে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের প্রাচীনতম ক্যাথলিক গির্জা, যা সৈয়দপুর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক উভয় দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ধর্মীয় স্থানগুলোর মধ্যে কুন্দুপুকুর মাজার সারাদেশে সুপরিচিত। বছরজুড়ে এখানে ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে।
নীলফামারীর নামের পেছনে লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক শোষণের এক তিক্ত ইতিহাস। দুই শতাধিক বছর আগে এই অঞ্চলের উর্বর জমিতে ব্রিটিশ নীলকরেরা বিপুল পরিমাণে নীল চাষ শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন অসংখ্য নীলকুঠি। 'নীল খামার' থেকে 'নীল খামারী' এবং কালক্রমে সেটিই হয়ে ওঠে 'নীলফামারী'। ১৮৫৯-৬০ সালে কৃষকদের ব্যাপক আন্দোলনে নীল চাষ বন্ধ হয়ে গেলে নীলকরেরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে তাদের রেখে যাওয়া স্থাপনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি আজও এই জেলার পরিচয়কে সমৃদ্ধ করে রেখেছে।
যোগাযোগের দিক থেকে নীলফামারী বেশ সহজলভ্য। ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ও রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে সরাসরি আসা যায়। গ্রীনলাইন, নাবিল, শ্যামলী, হানিফসহ বিভিন্ন বাস সার্ভিসও চালু রয়েছে। দ্রুত যেতে চাইলে সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করেও এই জেলায় পৌঁছানো সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন