কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক দৃশ্য, হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গনগরী ও সমতলের অনন্য চা বাগান
বাংলাদেশের সর্ব-উত্তরের
জেলা
পঞ্চগড়
এমন
এক
অনন্য
পর্যটন
গন্তব্য, যেখান
থেকে
শীতের
স্বচ্ছ
আকাশে
খালি
চোখেই
দেখা
যায়
বিশ্বের
তৃতীয়
সর্বোচ্চ
পর্বতশৃঙ্গ
কাঞ্চনজঙ্ঘার
তুষারাবৃত
মহিমান্বিত
চূড়া
এই
দুর্লভ
অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের
আর
কোনো
প্রান্ত
থেকে
অর্জন
করা
সম্ভব
নয়। রংপুর বিভাগের এই
জেলাটি
তিনদিক
থেকে
ভারতের
পশ্চিমবঙ্গ
ও
সিকিম
রাজ্য
দ্বারা
বেষ্টিত
হওয়ায়
ভৌগোলিকভাবে
এটি
সত্যিকার
অর্থে
হিমালয়ের
দোরগোড়ায়
দাঁড়িয়ে
আছে।
একদিকে হিমালয়ের
অপরূপ
নৈসর্গিক
দৃশ্য, অন্যদিকে
হাজার
বছরের
প্রাচীন
দুর্গনগরীর
ধ্বংসাবশেষ, আর
বাংলাদেশের
একমাত্র
সমতলভূমির
চা
বাগানের
সবুজ
সমারোহ
পঞ্চগড়
সত্যিকার
অর্থেই
বাংলাদেশের
উত্তরের
এক
অমূল্য
রত্ন। প্রতিবছর হাজার হাজার
পর্যটক
এই
জেলার
অসাধারণ
প্রাকৃতিক
ও
ঐতিহাসিক
বৈচিত্র্যের
টানে
ছুটে
আসেন, এবং
পঞ্চগড়
ভ্রমণ
তাদের
জীবনের
অন্যতম
স্মরণীয়
অভিজ্ঞতায়
পরিণত
হয়।
পঞ্চগড় জেলার
পরিচয়
শুধু
একটি
প্রশাসনিক
এককে
সীমাবদ্ধ
নয়
এটি
একটি
সমৃদ্ধ
ভূগোল, ইতিহাস
ও
সংস্কৃতির
মিলনক্ষেত্র। রংপুর বিভাগের এই
জেলায়
রয়েছে
পাঁচটি
উপজেলা
পঞ্চগড়
সদর, তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী, বোদা
ও
দেবীগঞ্জ। প্রতিটি উপজেলাই আলাদা
বৈশিষ্ট্য
ও
আকর্ষণ
নিয়ে
গঠিত।
তেঁতুলিয়া উপজেলা
নিঃসন্দেহে
পঞ্চগড়ের
সবচেয়ে
আকর্ষণীয়
এবং
বহুলপরিচিত
গন্তব্য। এই উপজেলার সবচেয়ে
বড়
আকর্ষণ
হলো
শীতকালে
ভোরের
পরিষ্কার
আকাশে
কাঞ্চনজঙ্ঘার
তুষারাবৃত
চূড়া
দেখার
সুযোগ। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি
মাস
পর্যন্ত, বিশেষ
করে
ভোরের
প্রথম
আলোয়, এই
হিমালয়ের
রাজকীয়
শৃঙ্গটি
গোলাপি-সোনালি
আভায়
আলোকিত
হয়ে
ওঠে — এ
দৃশ্য
একবার
দেখলে
জীবনে
আর
ভোলা
যায়
না। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর
বারান্দায়
বসে
কিংবা
পিকনিক
কর্নারে
মহানন্দা
নদীর
তীরে
দাঁড়িয়ে
এই
মনোরম
দৃশ্য
উপভোগ
করা
যায়। তেঁতুলিয়া থেকে
কাঞ্চনজঙ্ঘার
দূরত্ব
মাত্র
প্রায়
১৫০
কিলোমিটার, যা
বাংলাদেশ
থেকে
হিমালয়
দর্শনের
সবচেয়ে
কাছের
বিন্দু।
ভিতরগড় দুর্গনগরী
হারানো
সভ্যতার
নীরব
সাক্ষী
ভিতরগড় দুর্গনগরী
বাংলাদেশের
সবচেয়ে
বড়
এবং
ঐতিহাসিকভাবে
সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ
প্রাচীন
দুর্গনগরীগুলোর
একটি। প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার
এলাকাজুড়ে
বিস্তৃত
এই
বিশাল
দুর্গটি
আনুমানিক
৭ম
থেকে
১২শ
শতাব্দীর
মধ্যে
নির্মিত
বলে
ঐতিহাসিকরা
মনে
করেন। চারটি স্তরের পরিখা
দ্বারা
বেষ্টিত
এই
দুর্গনগরীতে
প্রত্নতাত্ত্বিক
খননে
বৌদ্ধ
ও
হিন্দু
স্থাপত্যের
বহু
মূল্যবান
নিদর্শন
আবিষ্কৃত
হয়েছে। মন্দির, রাজপ্রাসাদ ও
সাধারণ
জনবসতির
ধ্বংসাবশেষ
এই
দুর্গের
ভেতরে
এখনো
ছড়িয়ে
আছে। ভিতরগড়ের ইতিহাস ঘাঁটলে
বোঝা
যায়
এই
অঞ্চলে
একসময়
কতটা
সমৃদ্ধ
ও
শক্তিশালী
নগরসভ্যতা
গড়ে
উঠেছিল। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের
প্রতি
আগ্রহী
যেকোনো
ভ্রমণকারীর
জন্য
ভিতরগড়
এক
অনন্য
অভিজ্ঞতা।
বাংলাবান্ধা জিরো
পয়েন্ট
চার
দেশের
সংযোগস্থল
তেঁতুলিয়া উপজেলার
বাংলাবান্ধায়
অবস্থিত
জিরো
পয়েন্ট
বা
শূন্য
বিন্দু
বাংলাদেশের
সর্বোত্তরের
ভৌগোলিক
স্থান। এটি কেবল একটি
সীমানা
পিলার
নয়, এটি
একটি
সক্রিয়
আন্তর্জাতিক
স্থলবন্দর
যেখান
থেকে
বাণিজ্য
পরিচালিত
হয়। এই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে
ভারতের
ফুলবাড়ী
স্পষ্ট
দেখা
যায়, এবং
পরিষ্কার
দিনে
দূরে
নেপাল
ও
ভুটানের
সীমান্ত
অঞ্চলও
দৃশ্যমান
হয়। একই সাথে চারটি
দেশের
সীমানা
অনুভব
করার
এই
বিরল
সুযোগ
ভ্রমণকারীদের
কাছে
বাংলাবান্ধাকে
অত্যন্ত
আকর্ষণীয়
করে
তুলেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক
পর্যটকদের
কাছে
এটি
এখন
একটি
প্রিয়
গন্তব্য।
সমতলের চা
বাগান
বাংলাদেশের
এক
অনন্য
গর্ব
বাংলাদেশে চা
চাষের
কথা
মনে
হলে
সাধারণত
সিলেটের
পাহাড়ি
চা
বাগানের
কথাই
মাথায়
আসে। কিন্তু পঞ্চগড়ে গড়ে
উঠেছে
বাংলাদেশের
একমাত্র
সমতলভূমির
চা
বাগান, যা
দেশের
চা
শিল্পে
এক
নতুন
অধ্যায়
যোগ
করেছে। মহানন্দা, করতোয়া, তালমা
ও
ডাহুক
নদীবিধৌত
এই
জেলার
উর্বর
মাটিতে
চা
চাষ
সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে
ব্যাপক
প্রসার
লাভ
করেছে। সবুজ চা বাগানের
মাঝে
হেঁটে
বেড়ানো, চা
পাতা
তোলার
দৃশ্য
দেখা
এবং
তাজা
চায়ের
সুবাস
উপভোগ
করা
এই
অভিজ্ঞতা
ভ্রমণকারীদের
মধ্যে
ক্রমশ
জনপ্রিয়
হয়ে
উঠছে।
রকস মিউজিয়াম
পাথরের
অনন্য
এক
দুনিয়া
পঞ্চগড় সরকারি
মহিলা
কলেজ
প্রাঙ্গণে
প্রতিষ্ঠিত
রকস
মিউজিয়াম
বা
পাথরের
জাদুঘর
বাংলাদেশে
সত্যিকার
অর্থেই
এক
অনন্য
প্রতিষ্ঠান। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে
নদীর
স্রোতে
বয়ে
আসা
বিভিন্ন
ধরনের
পাথর, বিরল
জীবাশ্ম
ও
খনিজ
পদার্থ
এই
জাদুঘরে
সংগৃহীত
ও
সংরক্ষিত
আছে। ভূতত্ত্ব, প্রকৃতিবিজ্ঞান
ও
ইতিহাসে
আগ্রহী
শিক্ষার্থী, গবেষক
ও
সাধারণ
দর্শনার্থী
সকলের
জন্য
এটি
একটি
জ্ঞানসমৃদ্ধ
গন্তব্য। এখানে সংগৃহীত পাথরগুলো
কোটি
কোটি
বছরের
পৃথিবীর
বিবর্তনের
ইতিহাস
বহন
করছে।
তেঁতুলিয়া চা
গবেষণা
কেন্দ্র
ও
গোলকধাম
মন্দির
বাংলাদেশ চা
বোর্ডের
তেঁতুলিয়া
চা
গবেষণা
কেন্দ্র
দেশের
চা
শিল্পের
উন্নয়নে
গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা
পালন
করছে। এখানে চায়ের বিভিন্ন
প্রজাতি, চাষাবাদ
পদ্ধতি
ও
প্রক্রিয়াজাতকরণের
কৌশল
নিয়ে
গবেষণা
পরিচালিত
হয়। দর্শনার্থীরা এই
কেন্দ্র
পরিদর্শন
করে
চা
চাষের
সম্পর্কে
প্রত্যক্ষ
ধারণা
লাভ
করতে
পারেন। অন্যদিকে, তেঁতুলিয়ার
কাছে
অবস্থিত
গোলকধাম
মন্দির
তার
অনন্য
স্থাপত্যশৈলী
ও
ধর্মীয়
ঐতিহ্যের
জন্য
পরিচিত। এই প্রাচীন হিন্দু
মন্দিরটি
স্থানীয়
সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্যের
এক
জীবন্ত
সাক্ষী।
পঞ্চগড়ের ইতিহাস
বহু
প্রাচীন
এবং
বহুস্তরীয়। এই অঞ্চলে মানববসতির
ইতিহাস
কয়েক
হাজার
বছর
পুরনো। প্রাচীনকালে এই
ভূখণ্ড
কামরূপ
রাজ্যের
অন্তর্ভুক্ত
ছিল, যা
বর্তমান
আসাম
থেকে
উত্তরবঙ্গ
পর্যন্ত
বিস্তৃত
ছিল। পরবর্তীতে কোচ রাজবংশের
উত্থানের
সাথে
সাথে
এই
অঞ্চল
কোচ
রাজ্যের
অংশে
পরিণত
হয়। কোচ রাজাদের শাসনামলে
পঞ্চগড়ে
বেশ
কয়েকটি
গড়
বা
দুর্গ
নির্মিত
হয়, যেগুলোর
নামানুসারে
পরবর্তীতে
জেলার
নামকরণ
হয়েছে 'পঞ্চগড়' অর্থাৎ
পাঁচটি
গড়ের
জেলা।
মোগল সাম্রাজ্যের
বিস্তারের
সাথে
সাথে
এই
অঞ্চলও
মোগল
শাসনের
অধীনে
আসে। মোগল আমলে পঞ্চগড়ের
ব্যবসা-বাণিজ্য
ও
যোগাযোগ
ব্যবস্থার
উন্নতি
হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ইস্ট
ইন্ডিয়া
কোম্পানির
আগমন
এবং
ব্রিটিশ
শাসন
প্রতিষ্ঠার
পর
পঞ্চগড়
দার্জিলিং
জেলার
অংশ
হিসেবে
প্রশাসনিকভাবে
পরিচালিত
হতে
থাকে। ব্রিটিশ আমলে এই
অঞ্চলে
চা
চাষের
সম্ভাবনা
প্রথম
অনুভূত
হয়েছিল, যদিও
তখন
মূলত
দার্জিলিং
ও
সিলেট
অঞ্চলেই
চা
চাষ
বিকশিত
হয়।
১৯৪৭ সালে
ভারত-পাকিস্তান
বিভাজনের
সময়
পঞ্চগড়
পূর্ব
পাকিস্তানের
অংশ
হিসেবে
অন্তর্ভুক্ত
হয়। ১৯৭১ সালে মহান
মুক্তিযুদ্ধের
মধ্য
দিয়ে
স্বাধীন
বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠার
পর
পঞ্চগড়
বাংলাদেশের
একটি
মহকুমা
হিসেবে
রংপুর
জেলার
অধীনে
থাকে। ১৯৮৪ সালে দেশব্যাপী
প্রশাসনিক
বিকেন্দ্রীকরণের
অংশ
হিসেবে
পঞ্চগড়
স্বতন্ত্র
জেলার
মর্যাদা
লাভ
করে।
ভৌগোলিক দিক
থেকে
পঞ্চগড়
বাংলাদেশের
সবচেয়ে
বৈচিত্র্যময়
জেলাগুলোর
একটি। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত
হওয়ায়
এই
জেলার
মাটিতে
নদীর
মাধ্যমে
হিমালয়
থেকে
আসা
বিভিন্ন
ধরনের
পাথর, খনিজ
ও
পলি
জমা
হয়েছে, যা
মাটিকে
বিশেষভাবে
উর্বর
করেছে। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই
পঞ্চগড়কে
সমতলে
চা
চাষের
উপযোগী
করে
তুলেছে
এবং
রকস
মিউজিয়াম
প্রতিষ্ঠার
মূল
ভিত্তি
প্রদান
করেছে।
পর্যটন শিল্পের প্রেক্ষাপটে পঞ্চগড় গত দুই দশকে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একসময় যে জেলাটি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল, আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভ্রমণ সাহিত্যের বদৌলতে তা সারাদেশে পরিচিত। বিশেষত কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের অভূতপূর্ব সুযোগটি পঞ্চগড়কে বাংলাদেশের ভ্রমণ মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে, আবাসন সুবিধা বাড়ছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে ফলে আগামী দিনগুলোতে পঞ্চগড় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী থেকে হানিফ, নাবিল ও এস আর ট্রাভেলসের সরাসরি বাসে পঞ্চগড় যাওয়া যায়। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস বা একতা এক্সপ্রেসে পঞ্চগড় রেলস্টেশনে নামা যায়। পঞ্চগড় শহর থেকে তেঁতুলিয়া প্রায় ৪৫ কিলোমিটার সিএনজি অটোরিকশা বা লোকাল বাসে সহজেই যাওয়া যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন