কন্টেন্ট ক্রিয়েটর থেকে সাধারণ নাগরিক সাংবাদিকতার মূলনীতি না জানলে ডিজিটাল দুনিয়ায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা, ২০ এপ্রিল প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখলেই ভেসে আসে শত শত তথ্য, ভিডিও আর খবর। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি অর্ধসত্য তা বোঝার ক্ষমতা এখন প্রতিটি মানুষের জন্যই জরুরি হয়ে উঠেছে। ঠিক এই জায়গাতেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে জার্নালিজম তথ্য সংগ্রহ,যাচাই, বিশ্লেষণ এবং জনগণের কাছে সৎভাবে উপস্থাপন করার এই পেশাদার প্রক্রিয়া। মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জার্নালিজম এখন আর কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা নয় ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সকলের জন্যই এটি একটি অপরিহার্য জীবনদক্ষতায় পরিণত হয়েছে।
জার্নালিজম শুধু খবর লেখা নয়?
জার্নালিজম বলতে অনেকে শুধু সংবাদপত্রে খবর লেখা বোঝেন। কিন্তু এর পরিধি আসলে অনেক বিস্তৃত। সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক যেকোনো তথ্য রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সংস্কৃতি সংগ্রহ করে, যাচাই করে এবং জনগণের সামনে তুলে ধরাই হলো জার্নালিজমের মূল কাজ। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, "কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং এর প্রভাব কী" এই তিনটি প্রশ্নের সৎ ও নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করাই জার্নালিজমের প্রাণ।
জার্নালিজম দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি মূল স্তম্ভের উপর সত্যতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা, জনস্বার্থ এবং স্বাধীনতা। এই পাঁচটি নীতি মেনে চলা একজন সাংবাদিককে কেবল একজন তথ্য পরিবেশকই নয়, সমাজের একজন দায়িত্বশীল রক্ষকে পরিণত করে। প্রিন্ট ও ব্রডকাস্টের পাশাপাশি ডিজিটাল, ফটো, ইনভেস্টিগেটিভ, ডেটা এবং সিটিজেন জার্নালিজম এই বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে আজকের সাংবাদিকতা এগিয়ে চলেছে।
কেন শেখা দরকার?
জার্নালিজমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সরকার, রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম। ইতিহাস বলে, একটি সৎ প্রতিবেদন দুর্নীতিবাজকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতেও পরিবর্তন আনতে পারে।
শুধু সমাজ পরিবর্তনের জন্য নয়, পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্যও জার্নালিজম শেখা অত্যন্ত কার্যকর। এই বিষয়টি শিখলে একসাথে তৈরি হয় গবেষণা করার ক্ষমতা, সুন্দরভাবে লেখার দক্ষতা, সাক্ষাৎকার নেওয়ার পারদর্শিতা এবং যেকোনো পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সক্ষমতা। এছাড়াও, জার্নালিজম শেখা মানুষ যেকোনো তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না সে প্রশ্ন করে, যাচাই করে এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। এই গুণটি আধুনিক জীবনে অমূল্য।
ক্যারিয়ারের দিক থেকেও জার্নালিজমের সুযোগ বিশাল। শুধু সংবাদমাধ্যমেই নয়, কর্পোরেট কমিউনিকেশন, পাবলিক রিলেশনস এবং কন্টেন্ট মার্কেটিংয়েও জার্নালিজমের দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
ডিজিটাল ক্রিয়েটরদের জন্য কেন অপরিহার্য?
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এখন লক্ষ লক্ষ মানুষ YouTube, Facebook, TikTok ও Instagram-এ কন্টেন্ট তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশই জার্নালিজমের মূলনীতি সম্পর্কে সচেতন নন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অসচেতনতা শুধু কন্টেন্টের মান কমাচ্ছে না বরং সমাজেও মারাত্মক ক্ষতি করছে।
জার্নালিজমের জ্ঞান একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিশ্বাসযোগ্যতা। যে ক্রিয়েটর তথ্য যাচাই করে উপস্থাপন করেন এবং সূত্র উল্লেখ করেন, দর্শক তাকে বিশ্বাস করে। আর যে ক্রিয়েটর যা শুনেছেন তাই বলেন, সূত্র উল্লেখ করেন না সে হয়তো একসময় ভাইরাল হন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা হারান এবং চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কন্টেন্টের মানের দিক থেকেও জার্নালিজম শেখার সুবিধা অপরিসীম। একজন জার্নালিজম-সচেতন ক্রিয়েটর জানেন কীভাবে গল্প বলতে হয়, কীভাবে তথ্য গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হয় এবং কীভাবে দর্শকের মনোযোগ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা যায়। পাশাপাশি, জার্নালিজমের নীতি না জেনে কন্টেন্ট বানালে মানহানির মামলা, কপিরাইট লঙ্ঘন বা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর দায়ে আইনি ঝামেলায় পড়তে হতে পারে যা জার্নালিজম সম্পর্কে সচেতন একজন ক্রিয়েটর সহজেই এড়াতে পারেন।
আর্থিক দিক থেকেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশ্বাসযোগ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ কন্টেন্ট বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেশি মূল্যবান। স্পনসরশিপ পাওয়া সহজ হয়, YouTube-এ রিচ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়। ভারতের Dhruv Rathee বা আন্তর্জাতিক VICE News-এর মতো চ্যানেলগুলো মূলত জার্নালিজমের পদ্ধতি ব্যবহার করেই কোটি কোটি দর্শকের আস্থা অর্জন করেছে।
ব্যক্তিজীবনে জার্নালিজমের ভূমিকা
জার্নালিজম শুধু পেশাজীবীদের জন্য নয় এর দক্ষতা প্রতিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও গভীরভাবে কাজে আসে।
প্রথমত, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জার্নালিজমের চিন্তাপদ্ধতি অসাধারণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য, আর্থিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক মতামত তৈরিতে যে মানুষ তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ দক্ষতার উন্নতি ঘটে। জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় বলার যে দক্ষতা জার্নালিজমে শেখানো হয়, তা অফিসে প্রেজেন্টেশন থেকে শুরু করে পারিবারিক আলাপচারিতা পর্যন্ত প্রতিটি যোগাযোগে কাজে আসে।
তৃতীয়ত, সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা বিকশিত হয়। "কে বলছে? কেন বলছে? তার স্বার্থ কী?" এই প্রশ্নগুলো করতে শেখা মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।
চতুর্থত, ভুয়া বিনিয়োগ প্রকল্প, মিথ্যা স্বাস্থ্য দাবি বা রাজনৈতিক গুজব জার্নালিজমের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে এই ধরনের প্রতারণা সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পঞ্চমত, নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হয়। একজন ভালো নেতা সবসময় তথ্য সংগ্রহ করেন, বিশ্লেষণ করেন এবং দলকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন এই পুরো প্রক্রিয়াটাই মূলত জার্নালিজমের দক্ষতার প্রয়োগ।
সবশেষে, জার্নালিজম মানুষকে তার চারপাশের সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাস গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে হলে এই বোঝাপড়া অপরিহার্য।
বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতা সবসময় একটি মুক্ত সমাজের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিলিয়ে শতাধিক সংবাদমাধ্যম সক্রিয় রয়েছে। দেশে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত পেশাদার শিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালু রয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের এই যুগে জার্নালিজমের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। মিডিয়া ও সংবাদের পাশাপাশি ডিজিটাল মিডিয়া, কর্পোরেট কমিউনিকেশন এবং স্বাধীন পেশায় জার্নালিজমের দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সংবাদ সাংবাদিক ও ফিচার রাইটার থেকে শুরু করে পডকাস্টার, ডিজিটাল এডিটর, PR বিশেষজ্ঞ, ব্র্যান্ড স্টোরিটেলার এবং মিডিয়া কনসালট্যান্ট এই পুরো পরিসরজুড়েই জার্নালিজমের জ্ঞান এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন